বাঁশের ডগায় মোবাইল রেখে ফ্রিল্যান্সিং, প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে চলেছেন ফজলে এলাহী
চিত্র: ফজলে এলাহী ও তাঁর সংগ্রামী ফ্রিল্যান্সিং জীবনের গল্প | ছবি: সংগৃহীত
করোনাভাইরাসের মহামারিতে চাকরি হারিয়ে অনেকের মতোই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা তরুণ ফজলে এলাহী। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় তাঁকে একাধিক কাজ করতে হয়েছে। একসময় ফিরে যেতে হয়েছে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু প্রতিকূলতা তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। ইন্টারনেটের দুর্বল সংযোগের সঙ্গে লড়াই করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের পথে এগিয়ে চলেছেন তিনি।
ফজলে এলাহীর এই যাত্রার বিশেষ দিক হলো, প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ পেতে কখনো জানালার পাশে, কখনো বাঁশের ডগায় মোবাইল রেখে হটস্পট ব্যবহার করতে হয় তাঁকে। প্রযুক্তিনির্ভর কাজের জন্য যেখানে স্থিতিশীল ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এমন সীমাবদ্ধতা নিয়েই কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা তাঁর সংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
করোনায় চাকরি হারিয়ে শুরু হয় কঠিন সময়
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছিলেন ফজলে এলাহী। উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের পর তাঁর সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারির সময় হঠাৎ চাকরি হারানোয় সেই পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব ও নিজের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোও কঠিন হয়ে ওঠে। পকেটে অর্থ ছিল সীমিত, সামনে কীভাবে চলবেন, তা নিয়েও ছিল দুশ্চিন্তা। এমন পরিস্থিতিতে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় থেকে নতুনভাবে লড়াই শুরু করেন তিনি।
সে সময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁকে একসঙ্গে দুটি কাজ করতে হয়েছিল। রাতে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে নিরাপত্তাপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করতেন। আর দিনের বেলায় রাজধানীর ইস্কাটনের একটি বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে চিঠি বিলি ও ডেটা এন্ট্রির কাজ করতেন।
একদিকে রাতের দায়িত্ব, অন্যদিকে দিনের কাজ—সব মিলিয়ে সময় ও শারীরিক পরিশ্রমের চাপ ছিল অনেক। তবু পরিবারের কথা ভেবে কাজ চালিয়ে গেছেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ফজলে এলাহী প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুব কষ্ট করে চলতে হতো। হাঁপিয়ে উঠতাম। কিন্তু পরিবারের কথা মনে করে নিজেকে সামলে কাজ করে যেতাম।’
গ্রামের বাড়িতে ফেরা, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
করোনার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠলে ঢাকার কাজকর্ম ছেড়ে কুড়িগ্রামের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ফজলে এলাহী। তখন তাঁর আর্থিক অবস্থাও ছিল নাজুক। জীবনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, কীভাবে আবার আয় শুরু করবেন—এসব প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর ছিল না।
শহরের কর্মব্যস্ত জীবন ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে ফিরে আসার পর নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। সেখানে সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা মিলিয়ে সামনে এগোনো সহজ ছিল না। বিশেষ করে ইন্টারনেটনির্ভর কাজ করার ক্ষেত্রে দুর্বল নেটওয়ার্ক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তবে চাকরি হারানোর অভিজ্ঞতা কিংবা আর্থিক সংকটকে জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখেননি তিনি। বরং নিজের সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে নতুন করে কিছু করার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে কাজের সুযোগ তৈরির পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়।
বাঁশের ডগায় মোবাইল, ইন্টারনেটের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই
ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো প্রযুক্তিনির্ভর কাজ করতে ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করায় ফজলে এলাহীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ পাওয়া কঠিন। সংযোগের মান কিছুটা ভালো পাওয়ার আশায় কখনো জানালার পাশে মোবাইল রাখতে হয়, আবার কখনো মোবাইলটি বাঁশের ডগায় তুলে হটস্পট চালু করতে হয়।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এ ধরনের ব্যবস্থা অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কাজ চালিয়ে যেতে হলে বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিকল্প থাকে না। তাঁর এই প্রচেষ্টা দেখায়, প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগাতে আগ্রহ থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট এখনো অনেকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এখানে শুধু একজন ব্যক্তির সংগ্রামের গল্প নয়, গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটের মান ও ডিজিটাল কাজের সুযোগের বিষয়টিও সামনে আসে। অনলাইনে কাজের জন্য দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য সংযোগ, উপযুক্ত পরিবেশ এবং নিয়মিত কাজ করার সুযোগ। এসব সুবিধার ঘাটতি থাকলে দক্ষ ব্যক্তিকেও বাড়তি বাধা অতিক্রম করতে হয়।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে এগিয়ে চলার গল্প
ফজলে এলাহীর অভিজ্ঞতা তরুণদের কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর চাকরির অনিশ্চয়তা, আর্থিক চাপ কিংবা উপযুক্ত সুযোগের অভাব অনেককে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করে। ফ্রিল্যান্সিংও তেমন একটি পথ, যেখানে দক্ষতা, কাজের অভ্যাস এবং প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে ফ্রিল্যান্সিংকে সহজ বা নিশ্চিত আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে কাজ শেখা, সময় দেওয়া, ক্লায়েন্টের চাহিদা বোঝা এবং মান বজায় রাখার মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা থাকলে কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও কঠিন হতে পারে। ফজলে এলাহীর অভিজ্ঞতা এসব বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়—চাকরি হারানো, ঢাকায় একাধিক কাজ করে টিকে থাকা এবং গ্রামের বাড়িতে ফিরে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা—সব মিলিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি চিত্র পাওয়া যায়। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও এ অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়।
প্রত্যন্ত গ্রামের অভিজ্ঞতা যে প্রশ্ন সামনে আনে
বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক কাজের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়লেও সব এলাকার মানুষ সমান প্রযুক্তিগত সুবিধা পান না। শহরের তুলনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংযোগের মান, অবকাঠামো এবং কাজের পরিবেশের সীমাবদ্ধতা অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শুধু প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা অর্জনই যথেষ্ট নয়; সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর পরিবেশও প্রয়োজন।
ফজলে এলাহীর সংগ্রাম সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজেন। একই সঙ্গে এমন পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে, যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণেরা নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়ে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন।
কুড়িগ্রামের উলিপুরের এই তরুণের গল্প তাই কেবল ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রামের বিবরণ নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর কর্মজীবনের সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও ভাবার অবকাশ তৈরি করে। বাঁশের ডগায় মোবাইল তুলে সংযোগ পাওয়ার চেষ্টা তাঁর দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ। আর সেই বাস্তবতার মধ্যেই রয়েছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা।
প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য সরবরাহকৃত সংবাদ বিবরণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফজলে এলাহীর নির্দিষ্ট আয়, ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজের ধরন, ক্লায়েন্ট বা অর্জনের পরিসংখ্যান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
Post a Comment