অনিয়ম ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগের মুখে ডব্লিউএইচও থেকে পদত্যাগ করলেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
চিত্র: সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক প্রধান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে ওঠার নিরপেক্ষ তদন্ত চলাকালীন সময়েই তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দফতরে এই পদত্যাগপত্র জমা দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স বুধবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের কাছে স্বহস্তে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ। তবে জাতিসংঘভিত্তিক এই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত করেনি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও বৈশ্বিক চাপের প্রভাবেই এমন সিদ্ধান্তের সৃষ্টি হয়েছে।
টেড্রোস আধানমের কাছে পদত্যাগপত্র জমা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের (SEARO) প্রধান হিসেবে সায়মা ওয়াজেদের দায়িত্বগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবসময়ই আলোচনায় ছিল। তবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, জাতিসংঘের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য সংস্থাটি সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে গুরুতর কিছু প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এখনো সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নাম, পদবী, ছবি এবং তার পূর্বের নিয়োগ সংক্রান্ত প্রেস রিলিজ অপরিবর্তিত দেখা যাচ্ছে। তবে রয়টার্স তাদের বিশেষ সূত্রের বরাতে উল্লেখ করেছে, পদত্যাগপত্র দাখিলের পর এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে অফিসিয়াল বক্তব্য বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আর্থিক জালিয়াতি ও যোগ্যতার জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ
পদত্যাগের নেপথ্যে যেসব গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল হলো চীনে রাষ্ট্রীয় সফরসংক্রান্ত আর্থিক জালিয়াতি। ডব্লিউএইচও'র অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গেছে, উক্ত সফরের ক্ষেত্রে আর্থিক তহবিলের ব্যতিব্যাস ও অপব্যবহার হয়েছে।
এছাড়া পদ গ্রহণের সময় সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তার একাডেমিক যোগ্যতা ও পেশাদার অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত যেসব কাগজপত্র উপস্থাপন করেছিলেন, সেখানেও মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। রয়টার্স ২০২৬ সালের ৩ জুলাই সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীদের ডব্লিউএইচও-কে পাঠানো একটি গোপনীয় চিঠি পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, যেখানে এসব অভিযোগের বিষদ উল্লেখ রয়েছে।
"ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীনে সফরসংক্রান্ত প্রশাসনিক আর্থিক অনিয়ম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অসত্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ উত্থাপন করেছে।" — রয়টার্স
অভিযোগ অস্বীকার ও আইনি লড়াইয়ের আভাস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যৌথ ও পৃথক অনুসন্ধানের মুখোমুখি থাকা অবস্থায় সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার আইনজীবীদের পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়েছে, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সায়মা ওয়াজেদের এই পদটি ধরে রাখা নিয়ে নানাবিধ কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও আঞ্চলিক প্রধান পদে একজন বিতর্কিত ব্যক্তির ধারাবাহিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াকাল
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক সংস্থার আঞ্চলিক প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের মাধ্যমে সংস্থাটির সততা ও কাঠামোগত স্বচ্ছতা রক্ষা পাবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে, এ অঞ্চলের স্বাস্থ্য খাতের নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের একটি নতুন পথ তৈরি হলো।
সংস্থাটি নতুন একজন আঞ্চলিক প্রধান নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত কীভাবে তাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় কার্যক্রম সচল রাখবে এবং চলমান আন্তর্জাতিক তদন্তের বিষয়ে পরবর্তীতে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেদিকে এখন বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি রয়েছে।
Post a Comment